.:: প্রাচীন ভূগোলবিদ ইরাটোসথেনিস এবং পৃথিবীর প্রথম পরিধি নির্ণয় ::.

খ্রীষ্টপুর্ব ৭০০ থেকে ২০০ খ্রীষ্টাব্দ সময়কালেই আধুনিক বিজ্ঞানের গোড়া পত্তন হয়েছিল। প্রাক গ্রীক যুগে পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের ভাবনা ছিল অদ্ভুুত। তারা পৃথিবীকে ভাবতো চ্যাপ্টা থালার ন্যায়। প্রাক গ্রীক যুগের শেষেরদিকে গ্রীক যুগের প্রথমার্ধে পৃথিবীর মানুষের চিন্তা ভাবনা আমূল পরিবর্তন করতে জন্ম নেয় পীথাগোরাস, থালেস, হেকাটিয়াস, হেরাডোটাস, এরিষ্টটল ও প্লেটোর মত জ্ঞান সাধকেরা। তাদের মধ্যেরই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ইরাটোসথেনিস। ইরাটসথেনিসের ২৭৬ খ্রীষ্টাব্দে সিরিনে (বর্তমানে লিবিয়া) জন্মগ্রহন করেন। সিরিনে জন্ম গ্রহন করলেও তিনি শিক্ষার জন্যে এথেন্সে যান এবং ৩০ বছর বয়সে আলেকজেন্দ্রিয়া লাইব্রেরীর প্রধান লাইব্রেরিয়ান হিসেবে নিযুক্ত হন। তৎকালীন সময়ে জ্ঞান সাধনার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট স্থান ছিল আলেকজেন্দ্রিয়া লাইব্রেরী। ইরাটোসথেনিসকে বলা হয় গানিতিক ভূগোলের জনক। তিনি সর্বপ্রথম পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করেন এবং পৃথিবী থেকে চাঁদ ও সূর্যের আনুমানিক দূরত্ব বের করেন। ইরাটোসথেনিস মনে করতেন পৃথিবী গোলাকার। তিনি পৃথিবীর মানচিত্রাঙ্কানে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখেন। তিনি পৃথিবীকে ইউরোপ, এশিয়া, লিবিয়া এই তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত করেন। এছাড়া পৃথিবীকে পাঁচটি জলবায়ু অঞ্চলে ভাগ করেন। এর মধ্যে একটি উষ্ণ মন্ডল, পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিনে দুইটি নাতিশীতোষ্ণ মন্ডল এবং দুইটি বরফ দ্বারা আবৃত মন্ডল। তাঁর অঙ্কিত মানচিত্রেই প্রথম দেখা যায় ৯টি অক্ষরেখা এবং ১০টি দ্রাঘিমারেখা। এছাড়াও তিনি পদচারন করেছেন গনিত, দর্শণ, সাহিত্য এবং সঙ্গীতে। পরবর্তীতে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক হানাহানিতে আলেকজেন্দ্রিয়া লাইব্রেরী পুড়িয়ে ফেলার কারনে তার অনেক মুল্যবান কাজ নষ্ট হয়ে যায়। শেষ বয়সে এসে তিনি অন্ধ হয়ে যান যা তার জ্ঞান সাধনায় বিঘ্ন ঘটায়। অন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে পড়াশোনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন এবং হতাশ হয়ে পড়েন। পরে অনাহার এবং অযত্নের মাধ্যমে নিজেই নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেন। এর প্রায় ১ বছর পরই ১৯৪ খ্রীষ্টপূর্বে মৃত্যূবরন করেন।

পৃথিবীর প্রথম পরিধি নির্ণয়ঃ
ইরাটসথেনিস সূর্য রশ্মির পতন কোনের মাধ্যমে পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করেন। মিশরের সীন (বর্তমানে আসওয়ানিয়া) কর্কটক্রান্তি রেখার কাছে অবস্থিত। ফলে ২১ জুন তারিখে সেখানে সূর্য লম্বালম্বিভাবে আলো দেয়। তিনি লক্ষ করেন ২১ জুন তারিখে সীনে লম্বালম্বি ভাবে আলো দেওয়ার কারনে সীনে অবস্থিত একটি কূপের অভ্যন্তরভাগ সম্পুর্ন আলোকিত হয়ে যায় । একই দিনে সীন থেকে ৫০০০ স্টেডিয়া দূরত্বে অবস্থিত আলেকজেন্দ্রিয়ায় সূর্য ৭º১২’ কোনে হেলে আলো দেয় যা ৩৬০ এর ১/৫০ অংশ। ফলে তিনি অনুমান করেন পৃথিবীর পরিধি (৫০০০ * ৫০) অর্থাৎ ২৫০০০০ স্টেডিয়া বা ৪৬২৫০ কিলোমিটার।আরও সহজে বোঝার জন্যে নিচের চিত্রটা লক্ষ করুন।

চিত্রে ধরা যাক,
A = সীনের কূপ
B = আলেকজেন্দ্রিয়া
D = পৃথিবীর কেন্দ্র
AD = সীনের সূর্য রশ্মি
BC = আলেকজেন্দ্রিয়ার সূর্য রশ্মি
ABD = CBD = ৭º১২’
যেহেতু ৭º১২’ = ৫০০০ স্টেডিয়া
তাহলে সম্পূর্ণ পৃথিবী ৩৬০º = ৫০০০ * ৫০ = ২৫০০০০ স্টেডিয়া ( এখানে ৭º১২ হল ৩৬০º এর ১/৫০ অংশ)
এখানে উল্লেখ্য যে ১ স্টেডিয়া = ১৮৫ মিটার।
তাহলে ২৫০০০০ স্টেডিয়া = ৪৬২৫০ কিলোমিটার।
আধুনিক বিজ্ঞানের বদৌলতে এখন আমরা জানি পৃথিবীর পরিধি ৪০০৭৫ কিলোমিটার যা ইরাটোসথেনিসের পৃথিবীর পরিধির অনেক কাছাকাছি ছিল।

উৎসঃ টেকটিউনস

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top